বিএনপির সরকারবিরোধী বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়া শুরু

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিএনপি
ফাইল ছবি

সরকারবিরোধী বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়া শুরু করেছে বিএনপি। অবশ্য এ উদ্যোগ কতটা সফল হবে তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বৃহত্তর ঐক্য কঠিন কাজ। এ লক্ষ্যে পৌঁছাতে দলটির সামনে রয়েছে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে, জামায়াত প্রশ্নে দলটিকে কঠিন সিদ্ধান্তে আসতে হবে।

তাছাড়া বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় একটি জোট আছে। আছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এরপর আরও কয়েকটি দল নিয়ে বৃহত্তর ঐক্য হলে সেখানে জোট-ফ্রন্টের অংশগ্রহণ কিভাবে থাকবে তা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন।

বৃহত্তর ঐক্যের আগেই এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে দলটির হাইকমান্ডকে। পাশাপাশি জোট ও ফ্রন্টের শরিকদের মধ্যে সৃষ্ট দূরত্ব ঘোচাতে হবে। না হলে অনেকে বেঁকে বসতে পারে। যা ঐক্যের পরিবর্তে সৃষ্টি করবে অনৈক্য।

এছাড়া দলগুলোর পরস্পরের প্রতি আস্থা তৈরি করাও চ্যালেঞ্জ। বৃহত্তর ঐক্য হওয়ার পর রাজপথে কিভাবে আন্দোলন হবে, কারা নেতৃত্ব দেবেন, আন্দোলনের লক্ষ্য কি হবে! সে বিষয়গুলো নিয়েও ভাবতে হচ্ছে হাইকমান্ডকে। সাধারণ মানুষকেও আস্থায় আনতে হবে, কেন তাদের ডাকে তারা সাড়া দেবেন। দলটির নীতিনির্ধারকরা জানান, সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই তারা বৃহত্তর ঐক্যের দিতে অগ্রসর হচ্ছেন।

এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মত ও পথকে বলেন, বর্তমান ফ্যাসিস্ট সরকারকে হটাতে বৃহত্তর ঐক্যের বিকল্প নেই। আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এ প্রক্রিয়া শুরু করেছি। ইতোমধ্যে প্রাথমিক আলোচনাও হয়েছে। বৃহত্তর ঐক্যের মতো কঠিন কাজ সফলভাবে করতে গেলে আমাদের সামনে নানা চ্যালেঞ্জ আসবে। আমরা সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই এগোচ্ছি। আশা করি এতে সফল হতে পারব। কারণ আমরা যা চাইছি, দেশের মানুষ যা চাইছে সরকারবিরোধী অন্য দলগুলোর চাওয়া একই। তাই লক্ষ্য এক হলে ঐক্য হতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। বৃহত্তর ঐক্য মানে ২০ দল বা অন্য শরিকদের এড়িয়ে চলা নয়। আমরা সবাইকে নিয়েই এগোতে চাই। তবে কোন প্রক্রিয়ায় কিভাবে এগোবে তা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বৃহত্তর ঐক্যের ক্ষেত্রে জামায়াত বাধা হয়ে দাঁড়াবে না বলেও জানান বিএনপির এ শীর্ষ নেতা।

জানা যায়, ডান-বাম ঘরানার দলগুলোকে নিয়ে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলতে চায় বিএনপি। রাখা হবে ইসলামপন্থি কিছু দলও। এ আন্দোলন গ্রহণযোগ্য এবং পোক্ত করতে এক সময়ে আওয়ামী লীগের তকমা গায়ে লাগানো কিছু দলকে টার্গেট করে জোটে আনার পরিকল্পনাও আছে বিএনপির। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছে, ছোট দলের জনপ্রিয় নেতাদের জোটে টানতে পারলে রাজপথের আন্দোলন জোরদার হবে। পাশাপাশি নিজেদের সামর্থ্য সম্পর্কে ক্ষমতাসীনদের জানান দেওয়া যাবে।

বিএনপির নীতিনির্ধারকরা জানান, শুরুতে যুগপৎ আন্দোলনের লক্ষ্য নিয়ে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলা হতে পারে। বিএনপিসহ সরকারবিরোধী দলগুলোর চাওয়া-পাওয়া একই। কিন্তু যখন নেতৃত্বের প্রশ্ন আসবে তখনই দেখা দিতে পারে সংকট। কারণ, ইতোমধ্যে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, আগামী দিনে যাদের নিয়েই বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলা হোক এর মূল নেতৃত্বে থাকবে বিএনপি।

এমনকি যারা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্ব মানবে না তাদের সঙ্গে ঐক্য না করার পক্ষেও মত দিয়েছেন তারা। বৃহত্তর ঐক্য গঠনের আগে নেতাকর্মীদের এমন মতামত নিয়েও ভাবতে হচ্ছে। কারণ, গত নির্বাচনের আগে ঐক্যফ্রন্টে ড. কামাল হোসেনকে প্রধান নেতা নির্বাচন করে ভোটে অংশ নিয়ে বিএনপির অভিজ্ঞতা সুখকর হয়নি। তাই এবার যেসব দল নিয়ে ঐক্য হবে তাদের আস্থায় আনতে হবে।

বিএনপি সত্যিকার অর্থে দেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনতে চায়-দলগুলোর মধ্যে এমন আস্থা তৈরি করা কঠিন; তবে অসম্ভব নয় বলে মনে করছেন তারা। পাশাপাশি ঐক্য প্রক্রিয়ায় যেসব দল অন্তর্ভুক্ত হবে তাদের প্রতিও আস্থা থাকতে হবে। কঠিন পরিস্থিতি বা কোনো চাপে পড়ে তারা ঐক্য থেকে বেরিয়ে যাবে না-এমন ভরসার জায়গা তৈরি করতে হবে। দু-এক দিনের বৈঠকে এ আস্থা তৈরি সম্ভব নয়।

বৃহত্তর ঐক্যের ক্ষেত্রে বিএনপির সামনে আরেকটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জামায়াত। এ দলটি নিয়ে জোটে এবং জোটের বাইরে প্রশ্ন ও বিতর্ক আছে। জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে বৃহত্তর আন্দোলন করতে চাইলে তা সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াত একদিকে ফ্যাক্টর, অন্যদিকে সমস্যাও। সরকারের পতন চায় আবার জামায়াতকে এড়িয়েও চলতে চায়-সরকারবিরোধী এমন রাজনৈতিক দল একাধিক আছে।

জামায়াতের কারণে অনেক রাজনৈতিক দল বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে আসতে আগ্রহী নয়। এ বিষয়টি সুরাহা দরকার। তবে জামায়াত নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ বিএনপির জন্য খুব সহজ নয়। জামায়াতের যে ভোট আছে তা বিএনপির অন্য মিত্রদের নেই। ভোটের রাজনীতি মাথায় রেখেই জামায়াতকে রুষ্ট করতে চায় না বিএনপি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, যে কোনো পরিকল্পনা করা এবং তা বাস্তবে রূপ দেওয়া এক বিষয় নয়। বিএনপি যেভাবে ছক কষবে অন্য কেউ তা ভণ্ডুল করার চেষ্টা করবে না তা তো নয়। রাজনীতি হলো কৌশলের খেলা। রাজনীতির মাঠে দর্শকের চেয়ে খেলোয়াড় বেশি। তাই সে খেলায় জয়ী হওয়া দলটির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

এদিকে বৃহত্তর ঐক্যের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিকরা। বৃহত্তর ঐক্যের উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন তারা। তাদের মতে, বৃহত্তর ঐক্যের আগে বিএনপির হাইকমান্ডকে বেশকিছু কাজ করতে হবে। ২০ দলীয় জোট সেভাবে সক্রিয় নেই। একাধিক দল জোট ছেড়েছে, ভেঙেছেও। অনেকের রয়েছে মূল্যায়ন না করার অভিযোগ। নানা নির্যাতন সহ্য করে দীর্ঘদিন বিএনপির সঙ্গে রয়েছেন তারা। এখন তাদের মূল্যায়ন না করে অন্য দল নিয়ে রাজপথে সক্রিয় হলে অনেকেই ক্ষুব্ধ হতে পারেন।

শোনা যাচ্ছে, জোট ও ঐক্যফ্রন্ট নিষ্ক্রিয় করে বৃহত্তর ঐক্য করা হবে। তাহলে এ দুটি জোটের শরিকদের কার্যক্রম কি হবে সেটাও আগেভাগে চূড়ান্ত করা প্রয়োজন। আর এ কাজ করতে হবে বিএনপিকেই। কারণ, বড় এ জোটকে নিষ্ক্রিয় করে নেতাসর্বস্ব কিছু দল নিয়ে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলা হলে তাতে লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে না।

শেয়ার করুন