ব্যাংকিং কমিশন গঠন হবে কবে?

সম্পাদকীয়

অর্থপাচার
অর্থপাচার। ফাইল ছবি

খেলাপি ঋণ ও ঋণ গ্রহণ বা বিতরণে ব্যাপক অনিয়মসহ নানা বিষয়ে দেশের ব্যাংকিং খাতের নাজুক অবস্থা নিয়ে দেশীয় গণমাধ্যমে সম্প্রতি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন মহলে সমালোচনাও হচ্ছে। তবে এ খাতে ‘খারাপ অবস্থা’ দেখছেন না অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি ব্যাংকের অবস্থা ‘কোথায় খারাপ, তা লিখিত দিতে’ গতকাল মঙ্গলবার সাংবাদিকদেরকে বলেছেন। মত ও পথসহ সহযোগী বিভিন্ন অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও দৈনিক পত্রিকাগুলোর ওয়েবসাইট সংস্করণে অর্থমন্ত্রীর এমন বক্তব্য প্রচারিত হয়েছে।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সমস্যাগুলো চিহ্নিত না করে অর্থমন্ত্রী সেগুলোকে কীভাবে, কোন তথ্য ও যুক্তির ভিত্তিতে ঢালাও অস্বীকার করেছেন, তা আমাদের বোধগম্য হচ্ছে না। ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ও সমস্যাগুলো লিখিত আকারে অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া কোনো সাংবাদিকের দায়িত্বের আওতায় পড়ে না। সাংবাদিক তার সংবাদমাধ্যমে সেগুলো প্রকাশ, প্রচার করলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তরা সেগুলোর সত্যতা যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা ও পদক্ষেপ নেবেন, এটাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্বাভাবিক ও চর্চিত রীতি।

তাছাড়া যে কোনো সমস্যা প্রথমে চিহ্নিত করে একে দূর করতে ব্যবস্থা নিতে হয়। সমস্যাকে অস্বীকার করলে তা আরো গুরুতর হয়। ব্যাংকিং খাত ঘিরে সাম্প্রতিক সমালোচনাগুলো দেশের আর্থিক খাতের জন্য সতর্ক বার্তা হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে এ খাতের সমস্যা, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি।

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতির মন্দার আঁচ অন্যান্য দেশের মতো আমাদের অর্থনীতিতেও কম-বেশি লেগেছে। মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি, ডলার সংকট ও ঋণ আদায়ের গতিহীনতাও এখানে আছে। প্রভাবশালী মহল বিদেশে টাকা পাচার করায় অর্থনীতি ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থা সামনের বছর বিশ্বব্যাপী ভয়ানক মন্দার আশঙ্কা প্রকাশ করে ব্যাংক খাতে এর প্রভাব পড়ার ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছে। আগেভাগে দরকারি ও কার্যকর উদ্যোগ নিতে না পারলে কোনো দেশের ব্যাংক খাতে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলেও বৈশ্বিক সংস্থাগুলো বলছে। দেশের ব্যাংক খাতে বিদ্যমান কিছু সমস্যা নতুন নয়, সেগুলো আগে থেকেই ছিল। বৈশ্বিক মন্দায় ডলারের সংকট তা প্রকট আকারে প্রকাশ করে দিয়েছে।

ব্যাংক খাত বিপর্যস্ত হলে তা অর্থনীতির জন্য আরও খারাপ পরিণতি বয়ে আনতে পারে। যার প্রভাব পড়বে মূলত দেশের শিল্পখাত ও সাধারণ মানুষের ওপর। এজন্য ব্যাংক খাতে সম্ভাব্য অস্থিরতা মোকাবিলায় সংশ্লিষ্টদের এখনই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। আধুনিক অর্থনীতির সুস্বাস্থ্যের জন্য সুস্থ ও সবল ব্যাংকিং ব্যবস্থা যে কতোখানি গুরুত্বপূর্ণ, সেটা ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দার পর এখন বিশ্ববাসীর মুখস্ত।

সংশ্লিষ্টদের তাই শুধু ‘অতি আত্মবিশ্বাসী’ হয়ে বক্তব্য দিলেই আসন্ন বৈশ্বিক মন্দা মোকাবিলা করা ও ব্যাংকিং খাতের প্রতি এর প্রকৃত মালিক আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখা যাবে না। ব্যাংক খাতের সঞ্চয়ন, সুষ্ঠু নীতিমালা ও প্রবৃদ্ধির ধারা নির্ধারণ এবং প্রচলিত কার্যক্রম ও সার্বিক অবস্থান মূল্যায়ন ও বিবেচনা করার জন্য ব্যাংকিং কমিশন গঠনের কথা সরকারের পক্ষে অনেক আগেই জানানো হয়। সিপিডি ব্যাংক খাতসহ মোট পাঁচটি কমিশন গঠনের পরামর্শ দিলে সরকার ওই উদ্যোগ নেয়। তবে উদ্যোগ থমকে আছে।

আমরা মনে করি, দ্রুত এ কমিশনের বাস্তবায়ন করতে হবে। শুধু কমিশন গঠনেই হবে না, এর স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতাও থাকতে হবে। আসন্ন বিপর্যয় মোকাবিলায় ব্যাংক ও আর্থিক খাতে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি সংস্কারের পাশাপাশি এ খাতে শৃঙ্খলা, জবাবদিহি প্রতিষ্ঠাসহ আদর্শ ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

শেয়ার করুন