খিলক্ষেতে নববধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণ, সাবেক প্রেমিকসহ ৭জন গ্রেপ্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানী ঢাকার খিলক্ষেতে স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে এসে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এক নববধূ। এ ঘটনায় সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

শুক্রবার মধ্যরাতে খিলক্ষেতের বনরূপা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

universel cardiac hospital

শনিবার ভুক্তভোগী নববধূ খিলক্ষেত থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সাতজনকে আসামি করে মামলা করেছেন। ইতোমধ্যে এজাহারভুক্ত সব আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ওই নারীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান–স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) ভর্তি করা হয়েছে।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন— আবুল কাশেম সুমন ছাড়াও রয়েছে নূর মোহাম্মদ, হাসিবুল হাসান হিমেল, রবিন হোসেন, মীর আজিজুল ইসলাম, মেহেদী হাসান হৃদয় ও পার্থ বিশ্বাস।

পুলিশ জানায়, ভুক্তভোগী ওই নববধূ অঙ্গীভূত আনসার সদস্য। মিরপুরের একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।

মামলাসূত্রে জানা যায়, স্বামীর সঙ্গে ওই নববধূ তার এক বোনের বাসায় বেড়াতে এসে রাতে সাভার ফিরছিলেন। নতুন বিমানবন্দর ‍ঘুরতে গেলে সেখানে ওই নারীর সাবেক প্রেমিকসহ সাতজন তাদের গতিরোধ করে। এরপর বনরূপা এলাকায় নিয়ে গিয়ে স্বামীকে আটকে রেখে নববধূকে ধর্ষণ করে অপহরকারীরা।

ঢাকা মহানগর পুলিশের ক্যান্টনমেন্ট জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) শেখ মুত্তাজুল ইসলাম বলেন, ‘পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে কাশেম জানান, ওই নারীর সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল; তাকে বিয়ে না করায় পরিকল্পিতভাবে দলবল নিয়ে ওই নারীকে তুলে এনে ধর্ষণ করা হয়েছে।’

মামলার এজাহারে নববধূ বলেন, ‘বিমানবন্দর থানাধীন কাওলা বাজার এলাকায় আমার এক পরিচিত বোনের বাসায় বেড়াতে যাই। রাতে আমার সঙ্গে বাসায় ফেরার উদ্দেশে বের হই। রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টায় বনরূপা যাত্রী ছাউনির সামনে গেলে আসামি আবুল কাশেমসহ (৩৯) অজ্ঞাত তিনজন আমাদের গতিরোধে করে। এসময় আরও তিনজন অজ্ঞাত সিএনজিযোগে আসে। আসামি আবুল কাশেম আমার পূর্ব পরিচিত হওয়ায়ে আমাকে বলে— আপনার সাথে আমার কথা আছে। আমাদের সাথে চলেন। এরপর তাদের সঙ্গে বনরূপা আবাসিক এলাকায় গেলে তারা নানারকম প্রশ্ন করতে থাকে। এক পর্যায়ে তারা আমার স্বামীর কাছে ৭০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করে এবং মোবাইল ও নগদ পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে যায়।’

ভুক্তভোগী ওই নারী আরও বলেন, আমার স্বামীকে টাকা আনার জন্য ছেড়ে দেয়। এরপর আমার স্বামী টাকার জোগার করতে গেলে এক নম্বর আসামি আবুল কাশেমসহ অজ্ঞাত তিনজন আমাকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। বাকি তিন অজ্ঞাত আসামি ধর্ষণ না করলেও পাহারা দিয়ে ধর্ষণে সহায়তা করে।

মামলার বিবরণে আরও জানা যায়, আবুল কাশেম ওই নারীর পূর্ব পরিচিত হওয়ায় নববধূর সঙ্গে আলাদা কথা বলতে চান। নইলে অন্যরা তাদেরকে মারপিট করবে বলে হুমকি দেন। পরে ওই নববধূ ও তার স্বামী আসামির আবুল কাশেমের সঙ্গে বনরূপা আবাসিক এলাকায় যান। রাত ১২টা পর্যন্ত ওই নারীর স্বামীকে আটকে রেখে মুক্তিপণের টাকার জন্য পরে ছেড়ে দেয় আসামিরা। এরপর রাত ৩টার দিকে তারা পালাক্রমে ভুক্তভোগী নববধূকে ধর্ষণ করেন।

ওই তরুণীর স্বামী জানান, গত ১৮ মে ওই নারীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তাদের বাসা সাভারে। তার স্ত্রী মিরপুরে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। শুক্রবার অফিস থেকে খিলক্ষেত এলাকায় বোনের বাসায় যান ওই নারী। স্বামীও সাভার থেকে খিলক্ষেতে আসেন।

নববধূর স্বামী বলেন, ‘বোনের বাসা থেকে বের হয়ে বিমানবন্দর এলাকায় তাদের পূর্বপরিচিত এক ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের কথা ছিল। এরইমধ্যে স্ত্রী নতুন বিমানবন্দর দেখার আবদার করেন। এরপর রাত সাড়ে ৯টার দিকে আমরা বিমানবন্দরের উদ্দেশে হাঁটা শুরু করি। তৃতীয় টার্মিনালের কাছাকাছি এলাকায় প্রথমে চারজন আমাদের গতিরোধ করে। এরপর সিএনজি অটোরিকশায় আরও তিনজন এসে তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। এরপর তারা আমাদেরকে ভয়ভীতি দেখিয়ে খিলক্ষেতের বনরূপা আবাসিক এলাকায় একটি বাগান বাড়িতে নিয়ে যায়।’

এজহারে উল্লেখ করা হয়, ওই নারীর স্বামীর মোবাইল ফোনসেট ও নগদ ৫ হাজার টাকা কেড়ে নেয় আসামিরা। এরপর মুক্তিপণ হিসেবে প্রথমে তিন লাখ টাকা দাবি করে। শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে ৭০ হাজার টাকায় রফা হয়।

টাকা সংগ্রহের কথা বলে বনরূপা আবাসিক এলাকা থেকে বের হয়ে ভোররাতে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করেন ঘটনার শিকার নারীর স্বামী। পুলিশ ঘটনাটি জানার পরপরই সেখানে অভিযান চালায়। শুক্রবার রাতেই একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। শনিবার সকালে ভুক্তভোগী নারীকে ছেড়ে দেওয়া হয়। চাড়া পেয়ে নিজের স্বামীকে ফোন করেন তিনি।

পুলিশের গুলশান বিভাগের ডিসি রিফাত রহমান শামীম বলেন, ‘শুক্রবার রাতে ঘটনাটি জানানোর পরপরই অভিযান শুরু হয়। এখন পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচজন দলবদ্ধ ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। জড়িত একজন ওই তরুণীর পূর্ব পরিচিত।’

পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, তরুণীর ওপর ক্ষোভ থেকে টার্গেট করে সহযোগীদের নিয়ে সুমন লোমহর্ষক এ ঘটনায় জড়ায়। তার গ্রামের বাড়ি জামালপুরের কালিকাপুরে। খিলক্ষেত এলাকায় অনেক দিন ধরে থাকে। খিলক্ষেত এলাকায় ওই নারী যাবেন— এটা কোনোভাবে জানতে পেরেই ছক করেছিল সুমন। এরপর বন্ধুদের একত্রিত করে সাবেক প্রেমিকার ওপর প্রতিশোধ নেয়।

পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তারদের তথ্যের ভিত্তিতে এরইমধ্যে বেশ কিছু আলামত তারা জব্দ করেছে। ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য এসব পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডিতে পাঠানো হবে। তারপর ওই নারীকে ঢাকা মেডিকেলের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে পাঠানো হবে।

ওই নারীর স্বামী বলেন, ‘খুব দ্রুত ঘটনাটি ঘটে গেছে। প্রথমে জানতে চায় আমাদের সঙ্গে কী রয়েছে। মোবাইল সেট নিয়ে সিম খুলে দেয়। এক পর্যায়ে মুক্তিপণ দাবি করে। এরপর বললাম, মোবাইল ফোনসেট না পেলে কীভাবে যোগাযোগ করে টাকা দেবো।’

তিনি বলেন, ‘এত রাতে বিমানবন্দর এলাকায় না যাওয়ার জন্য স্ত্রীকে বারবার নিষেধ করেছিলাম। সেখানে ছিনতাইকারীসহ অনেক অপরাধীদের দৌরাত্ম্য– এটাও বলেছিলাম। যেটা আশঙ্কা করেছি তার চেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছি। তারা জিম্মি করে প্রথমে প্রাণনাশের ভয় দেখায়। চিৎকার করলে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। এ ঘটনার পর স্ত্রীকে কোনোভাবে শান্ত করতে পারছি না। সে এখনো ভয়ের মধ্যে আছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘হাতের মেহেদির রং মোছার আগেই আমার স্ত্রী এমন ভয়াবহ ঘটনার সাক্ষী হলো। যারা জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

পুলিশের ক্যান্টনমেন্ট জোনের এডিসি সাজ্জাদ ইবনে রায়হান বলেন, গ্রেপ্তাররা নেশার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। আগে থেকে তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা রয়েছে কিনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গ্রেপ্তার সবাইকে আজ আদালতে তোলা হবে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের ক্যান্টনমেন্ট জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) শেখ মুত্তাজুল ইসলাম বলেন, ‘ওই নারী গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় তাঁর স্বামীর সঙ্গে ঘুরতে বের হন। তাঁরা খিলক্ষেত থানা এলাকার ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কের বনরূপা এলাকায় গেলে সেখানে আবুল কাশেম ওরফে সুমন নামের এক ব্যক্তির নেতৃত্বে সাতজনের দল তাঁদের অপহরণ করে। ভুক্তভোগী নারী ও তাঁর স্বামীকে বনরূপা এলাকার ঝোপঝাড়ের ভেতরে নিয়ে যান দুর্বৃত্তরা। পরে স্বামীর কাছে ৭০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন তাঁরা। মুক্তিপণের টাকা আনার জন্য ছেড়ে দিলে তিনি বেরিয়ে এসে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন দেন। ভোর চারটার দিকে পুলিশ সেখান থেকে ভুক্তভোগী নারীকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যান।

তিনি আরও বলেন, ‘ভুক্তভোগী নারীর সঙ্গে কথা বলে পুলিশ জানতে পারে তিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ওই নারী পুলিশকে জানিয়েছেন, চারজন দুর্বৃত্ত তাঁকে ধর্ষণ করেন। পরে পুলিশ আজ শনিবার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে প্রধান আসামি কাশেমসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করে।’

শেয়ার করুন