কার্লাইল : বিএনপির সর্বশেষ প্রচেষ্টা : মহসীন হাবিব

হামেশাই বিএনপি নেতারা বক্তৃতা করতে গিয়ে বলে থাকেন, আগামী নির্বাচনে সরকারকে লেভেল প্লেইং ফিল্ড তৈরি করতে বাধ্য করা হবে। আরো বলে থাকেন, খালেদা জিয়াকে তারা জেল থেকে মুক্ত করে আনবেনই; খালেদাকে ছাড়া নির্বাচন নয়। তাদের এ বক্তব্য রাজনৈতিক। তারা এ কথায় বিশ্বাস করুন আর নাই করুন। এ বক্তব্যে দোষের কিছু দেখি না। বলতেই পারেন। তাদের নেত্রীকে জেল থেকে মুক্ত করার এরাদা থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। এটি গণতান্ত্রিক অধিকারও বটে। আমরাও চাই দেশে একটা সুষ্ঠ, নিরপেক্ষ নির্বাচন হোক। আমরাও চাই দেশের একটি বড় দলের চেয়ারপারসন জেল থেকে মুক্ত হোন। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুন। কিন্তু এই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি এবং খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার পন্থা সম্পর্কে বিএনপি যে পথ অবলম্বন করেছে এবং জাতিকে যে আভাস দিয়ে চলেছে তা অগ্রহণযোগ্য, অগণতান্ত্রিক এবং গর্হিত।


২০১৩ সালের পর রাজনৈতিকভাবে বিএনপি কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। সেই অবস্থা থেকে উত্তরণে বিএনপি কোনো গণতান্ত্রিক পন্থা অবলম্বন করে নাই। দেশের অভ্যন্তরে জনমত গঠন, সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হওয়ার চেষ্টা অথবা সরকারের নানা দুর্বলতা জনসম্মুখে বিস্তারিত তুলে ধরার বদলে এই ধারণা গ্রহণ করেছে যে কেবল আন্তর্জাতিক মহল সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করার ব্যাপারে; অতঃপর তা যদি যেন-তেনভাবে করা যায় তাহলেই তারা জয়লাভ করে মসনদে বসতে পারেন!
এই ধারণার বশবর্তী হয়ে সেই ২০১৩ সাল থেকে তারা বিদেশিদের কাজে লাগানোর অপতৎপরতা চালু রেখেছেন। এ কাজে তারা ব্যবহার করেছেন এবং করছেন নোবেল বিজয়ী বেনিয়া অধ্যাপক ইউনুস, জাফরুল্লার চৌধুরিসহ বেশ কয়েকজন আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিকে। তারা যে শুধু ঢাকায় বিশেষ করে পশ্চিমা কূটনীতিকদের দলে ভেড়াতে চেষ্টা করে চলেছেন তাই নয়, প্রবাসে অবস্থানরত কয়েকজন সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী এবং ব্যবসায়ীকে এ কাজে নিয়োজিত রেখেছেন। এ ছাড়া বেশ কিছু বিদেশিকে নিয়োজিত করার বিষয়টি প্রকাশ্যেও চলে এসেছে। মনে আছে নিশ্চয়ই এই সেদিন বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর ইসরায়েলের লিকুদ পার্টি নেতা মেন্দি সাফাদির সঙ্গে ভারতে বৈঠকের কথা। সে ষড়যন্ত্রের সবকিছ্ইু এখন পরিস্কার। সাফাদির সঙ্গে তার বৈঠকের ছবিও প্রকাশিত হয়েছিল বাংলাদেশের সব পত্র-পত্রিকায়। আসলাম চৌধুরী এখন কারা অভ্যন্তরে। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলেন ১৫০ কোটি টাকা। সেই ঋণ সুদাসলে হয়েছে ২৩৮ কোটি টাকা। ৮৮ কোটি টাকা ফিরিয়ে দিয়েছেন, বাদ বাকির খবর নাই। আসলাম চৌধুরী এবং তার পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের বিরুদ্ধে চট্টগামের আগ্রাবাদ শাখা থেকে ঋণপত্রের বিপরীতে ৩৭৭ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ আছে। তাঁর বিরুদ্ধে গোয়েন্দা পুলিশের দেওয়া একটি রাষ্ট্রদ্রোহী মামলাও রয়েছে। যাক সে কথা। আসলাম চৌধুরীর মাধ্যমে করা সেই লবিং ব্যর্থ হলে বিএনপি বেশ কিছুদিন পেছনে হটেছিল। মাঝখানে দেশি-বিদেশি কিছু আইনজীবী গোছের লোকদের কাজে লাগাতে চেষ্টা করেছে। তা হয়নি। এবার আবারও তারা আন্তর্জাতিকভাবে সরকারকে খাটো করতে চেষ্টা করেন ব্রিটিশ এমপি ও আইনজীবি লর্ড ব্যারন আলেক্সান্ডার কার্লাইলকে দিয়ে।

 

কার্লাইল দিল্লীতে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার পক্ষে একটি সংবাদ সম্মেলন করার উদ্দেশে ভারতে প্রবেশের চেষ্টা করেন। তিনি তার মত করে সব গুছিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু ১১ জুলাই বুধবার দিবাগত রাতে ভারত সরকার তাকে সেদেশে প্রবেশ করতে না দিয়ে বিমানবন্দর থেকেই ফিরিয়ে দেয়। এই ফিরিয়ে দেওয়ার সবচেয়ে বড় যুক্তিপূর্ণ কারণ ছিল, কার্লাইল সেখানে খালেদা জিয়ার পক্ষে সংবাদ সম্মেলন করবেন তা বলেননি। তিনি বিজনেস ভিসা গ্রহণ করেছিলেন ভারতের কতৃপক্ষের কাছ থেকে। আর আরেকটি নৈতিক কারণে ভারত তাকে ঢুকতে দেয়নি। সেটি হলো, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে মধুর সম্পর্ক বিদ্যমান। এই সময় বাংলাদেশের সরকারের বিরুদ্ধে দিল্লীতে বিষোদ্গার হবে তা ভারত সরকার মেনে নেয়নি। পাশ্ববর্তী একটি বন্ধুপ্রতীম দেশের সরকারের বিরুদ্ধে দিল্লীতে সংবাদ সম্মেলন করার অনুমতি দেওয়া যে শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে অসহযোগীতার শামিল সেটা বুঝতে দিল্লীর ঝানু রাজনীতিবিদ ও আমলাদের কোনো অসুবিধা হয়নি। অতএব এ চেষ্টাও বিএনপির ব্যর্থ হয়েছে।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিএনপির লবিং বারবার ব্যর্থ হওয়ার কারণ আছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে আন্তির্জাতিকভাবে শেখ হাসিনার বর্তমান সরকারের চেয়ে প্রসংশিত আর কোনো সরকার আসেনি। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিশ্বের সবচেয়ে বিপদগ্রস্থ ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে এক কথায় আশ্রয় দেওয়া, বিদ্যুত পরিস্থিতির উন্নয়ন, শিশুমৃত্যর হার বিস্ময়করভাবে কমিয়ে আনা নিয়ে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ইউরোপিয় ইউনিয়ন এমনকি সৌদি আরবও ভূয়সী প্রসংশা করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেখানেই সফরে গিয়েছেন, সকলেই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তাকে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন এবং গুরুত্ব দিয়ে তার কথা শুনেছেন। অন্যদিকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ইতিহাসের যে কোনো সময়ের চেয়ে উষ্ণ। যেন রাখিবন্ধন উৎসব চলছে।
ফলে বিএনপি এবং ব্রিটিশ ব্যারন আলেক্স কার্লাইল সুবিধা করতে পারেনি।

লেখক : সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

শেয়ার করুন

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে