দুই মাসেই এক বছরের অর্ধেক ব্যাংক ঋণ

বিশেষ প্রতিবেদক

নোট
ফাইল ছবি

সরকার চলতি অর্থবছরে বাজেটের ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাতে যে পরিমাণ ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা করেছিল, তার ৪৫ শতাংশ নেয়া হয়ে গেছে দুই মাসেই।

সূত্র মতে, জুলাই এবং আগস্টে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ হিসেবে ২০ হাজার ১১২ কোটি টাকা নেয়া হয়েছে। এই অর্থ গত অর্থবছরের ব্যাংক ঋণের ৬৭ শতাংশ।

সরকারের ব্যাংক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে এক লাখ ২৮ হাজার ২১৬ কোটি টাকা। গত জুনে ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষে সরকারের ব্যাংক ঋণের স্থিতি ছিল এক লাখ আট হাজার ১০৪ কোটি টাকা।

সরকারের ঋণগ্রহণ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে। এতে দেখা যায়, গত বছরের আগস্ট শেষে সরকারের ঋণের স্থিতি ছিল ৯৬ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। সে হিসেবে গত এক বছরে ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা।

প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখো গেছে, জুলাই এবং আগস্ট মাসে সরকারের নেওয়া মোট ঋণের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নিয়েছে ৯২৫ কোটি টাকা। বাকি ১৯ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা নিয়েছে তারল্য সংকটে থাকা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, অর্থবছরের শুরুতে সরকারের রাজস্ব আদায় কিছুটা কম থাকে। এ কারণে ব্যয় নির্বাহে বরাবর শুরুর দিকে ব্যাংক ঋণ নেয়ার পরিমাণ বাড়ে। পরে বাড়ে পরিশোধ। এই দুই মাসে অবশ্য ঋণ নেয়ার পাশাপাশি তিন হাজার ৬৬৪ কোটি টাকার বেশি ঋণ পরিশোধও করা হয়েছে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে কম ঋণ দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। কিন্তু সরকারকে যে পরিমাণ ঋণ দেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে, সেটি দেওয়া হলে বেসরকারি খাত এই পরিমাণ ঋণও পাবে না।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের শেষ মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেয়া হয়েছিল প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেই সরবরাহ করা হয় প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা।

গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে কম টাকার যোগান দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট থেকে সরকারের ঋণ আকারে টাকার যোগান দেওয়া হলে বাজারে নগদ টাকার প্রবাহ অনেক বেড়ে যায়।

তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এক টাকা বের করা হলে বাজারে সাড়ে সাত টাকার প্রভাব পড়ে। ব্যাংকগুলোর বর্তমান পরিস্থিতিকে বিবেচনায় নিয়েই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতির কিছুটা চাপ বেড়ে গেলেও মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরের আরও কয়েক মাস বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বাজারে নানাভাবে টাকার যোগান দেয়া হবে। ব্যাংকগুলোর বড় ধরনের নগদ টাকার সংকট না হয় সে জন্য রেপোর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর টাকার যোগান অব্যাহত রাখা হবে।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতি ব্যয় মেটাতে ব্যাংক খাতে ৪৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছরের এ লক্ষ্যমাত্রা ৪২ হাজার কোটি টাকা হলেও সংশোধিত বাজেটে তা ৩০ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। কারণ সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি ঋণ নেয়া হয়। ফলে ব্যাংক খাত থেকে কম ঋণ নিতে হয়েছে।

বড় অংকের ঘাটতি বাজেট দেওয়ায় সরকারের দেশি-বিদেশি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। আর সেই সঙ্গে বাড়ছে এসব ঋণের সুদ। আবার স্থানীয় ব্যাংক থেকে অতিমাত্রায় ঋণ নেয়ায় ব্যাংকের প্রকৃত বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে যাচ্ছে।

সরকার তার আপৎকালীন ব্যয় নির্বাহের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিনা সুদে চার হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারে। এর অতিরিক্ত হলেই ৯১ মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদের সমপরিমাণ সুদ কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পরিশোধ করতে হয়।

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here