পুঁজিবাজারে সক্রিয় কারসাজি চক্র

বিশেষ প্রতিবেদক

শেয়ারবাজার
শেয়ারবাজার

বিনিয়োগকারীদের বছরের পর বছর কোনো ধরনের লভ্যাংশ দেয় না বিচ হ্যাচারি। কোম্পানিটির কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে গেছে। স্বাভাবিক নিয়মেই দীর্ঘদিন ধরে এটি পুঁজিবাজারের পচা কোম্পানি বা ‘জেড’ গ্রুপের তালিকায় রয়েছে। অথচ এর পুঁজিবাজারে দফায় দফায় বাড়ছে দাম। শুধু বিচ হ্যাচারি নয়, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত প্রায় অর্ধশত দুর্বল কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে হঠাৎ হঠাৎ। মূলত কারসাজি চক্রের মুনাফা হাতিয়ে নেয়ার কৌশলের কারণেই এসব কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ছে।

শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক বাড়ার পরও নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়ায় বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ এসব কোম্পানির শেয়ার কিনছেন। তাদের কেউ লাভের মুখ দেখছেন, আবার কেউ ধরা খাচ্ছেন।

বছরের অধিক সময় ধরে পর্যালোচনা করে গত বছরের শেষের দিকে ডিএসই থেকে তথ্য প্রকাশ করা হয় যে, বিচ হ্যাচারির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ডিএসই এমন তথ্য দিলেও পুঁজিবাজারে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম হঠাৎ হঠাৎ বাড়ার প্রবণতা বন্ধ হয়নি।

২০১৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর জেড গ্রুপের এ কোম্পানির শেয়ারের দাম ছিল ১১ টাকা ৮০ পয়সা। সেখান থেকে অনেকটা টানা বেড়ে চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি এর দাম ১৭ টাকা ৬০ পয়সায় ওঠে। পরবর্তীতে কিছুটা কমে ১৩ জানুয়ারি ১৩ টাকা ৭০ পয়সায় দাঁড়ায়। এরপর আবারও বেড়ে ৯ ফেব্রুয়ারি লেনদেন শেষে দাঁড়ায় ১৬ টাকা ১০ পয়সা।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অপর কোম্পানি সমতা লেদার কমপ্লেক্স লিমিটেড। বিনিয়োগকারীদের নামমাত্র লভ্যাংশ দেয়া এ কোম্পানির শেয়ারের দাম বর্তমানে (৯ ফেব্রুয়ারি) ১৭৫ টাকা ৭০ পয়সা। পাঁচ বছরের অধিক সময় ধরে শেয়ারহোল্ডারদের কোনো ধরনের লভ্যাংশ না দেয়ায় ২০১৮ সালের অক্টোবরে কোম্পানিটির অবস্থা পর্যালোচনার উদ্যোগ নেয় ডিএসই। ডিএসইর সেই পর্যালোচনা যেন শেষই হয় না। এমন পরিস্থিতিতে ২০১৯ সালের জন্য ২ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করে ‘জেড’ গ্রুপ থেকে ‘বি’ গ্রুপে উঠে আসে প্রতিষ্ঠানটি।

নামমাত্র এই লভ্যাংশ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে কারসাজি চক্রটি সমতা লেদারের শেয়ারের দাম প্রায় ২০০ টাকার কাছাকাছি নিয়ে যায়। অথচ গত বছরের ২৯ অক্টোবর কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ছিল ৭৪ টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম বেড়েছে ১৩৮ শতাংশ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দুর্বল কোম্পানির শেয়ারের এমন দাম বাড়া কারসাজির-ই ইঙ্গিত বহন করে। কোনো চক্র পুঁজিবাজারে পরিকল্পিতভাবে এসব কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়াচ্ছে। এতে সার্বিক বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকতে হবে। সেই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। কারা এসব কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে তা চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

এদিকে বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউজ ঘুরে দেখা গেছে, সমতা লেদারের লভ্যাংশ ঘোষণাকে পুঁজি করে আরও কয়েকটি ‘জেড’ গ্রুপের কোম্পানির বিষয়ে বাজারে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। কার্যক্রম বন্ধ থাকা এবং বছরের পর বছর ধরে লভ্যাংশ না দেয়ায় প্রায় দুই বছর ধরে এসব কোম্পানির অবস্থা পর্যালোচনা করছে ডিএসই। পর্যালোচনার নামে ডিএসইর এই সময়ক্ষেপণও হাতিয়ার বানাচ্ছে কারসাজি চক্র। এ চক্র গুজব ছড়াচ্ছে যে, কোম্পানিগুলো উৎপাদনে আসছে এবং শিগগিরই বিনিয়োগকারীদের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা করবে।

ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, পাঁচ বছরের অধিক সময় ধরে লভ্যাংশ না দেয়ার কারণে ২০১৮ সালের আগস্টে মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ, বিচ হ্যাচারি, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, দুলামিয়া কটন, সমতা লেদার, শ্যামপুর সুগার মিলস, জিল বাংলা সুগার মিলস, ইমাম বাটন, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক, সাভার রিফ্র্যাক্টরিজ, বেক্সিমকো সিনথেটিক্স, জুট স্পিনার্স, শাইনপুকুর সিরামিক, সোনারগাঁও টেক্সটাইল ও ইনফরমেশন সার্ভিস নেটওয়ার্কের আর্থিক অবস্থা পর্যালোচনা শুরু করে ডিএসই।

এর মধ্যে বিচ হ্যাচারি, ইউনাইটেড এয়ার ও মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজের কার্যক্রম বন্ধ বলে ডিএসই থেকে তথ্য প্রকাশ করা হয়। বাকি কোম্পানিগুলোর মধ্যে সমতা লেদার সম্প্রতি লভ্যাংশ ঘোষণা করায় পর্যালোচনার তালিকা থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে বাদ দেয়া হয়। বাকি কোম্পানিগুলোর পর্যালোচনা এখনও শেষ করতে পারেনি ডিএসই।

এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, বিনিয়োগ করা পুঁজির নিরাপত্তার জন্য বিনিয়োগকারীদেরই উদ্যোগ নিতে হবে। কেউ যদি দুর্বল কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে নিজের অর্থ ঝুঁকির মধ্যে ফেলেন, তার দায় কেউ নেবে না।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. বখতিয়ার হাসান বলেন, যে কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধ, বছরের পর বছর লভ্যাংশ দেয় না- এমন কোম্পানিতে কারা বিনিয়োগ করছে তা খতিয়ে দেখা উচিত। ভালো কোম্পানি রেখে বন্ধ কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা, বিনিয়োগকারীদের এমন আচরণ কিছুতেই স্বাভাবিক বলা যায় না। এতে সার্বিক বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কারা এসব কোম্পানির শেয়ার নিয়ে নাড়াচাড়া করছে তা নিয়ন্ত্রক সংস্থার খতিয় দেখা উচিত।

এ বিষয়ে ডিএসইর এক সদস্য নাম প্রকাশ না করে বলেন, ডিএসই থেকে যে কয়েকটি কোম্পানির অবস্থা পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় তার সবকটির আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। এসব কোম্পানি তালিকাচ্যুত করা উচিত। কিন্তু প্রায় দুই বছর ধরে পর্যালোচনার নামে ডিএসই সময়ক্ষেপণ করছে। এতে কারসাজি চক্র সুযোগ নিয়ে মাঝেমধ্যে এসব কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়িয়ে ফায়দা লুটে নিচ্ছে। অথচ দীর্ঘ সময় ধরে শেয়ারবাজারে মন্দা চলছে। অনেক ভালো কোম্পানির শেয়ারের দাম অবমূল্যায়িত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কর্তৃপক্ষের উচিত এসব কোম্পানির বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া।

শেয়ার করুন

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে