করোনা কালের একগুচ্ছ কবিতা ।। মহিবুর রহিম

সাহিত্য প্রতিবেদক

বাংলাদেশ

অবিস্মরণীয় তার প্রাকৃতিক শোভা
স্বপ্নের মতন থোকা থোকা জলোগন্ধময়
চারদিকে লতাপাতা গুল্ম ও উদ্ভিদ।

সবুজ ঐশ্বর্যে ঢাকা, কত শতাব্দী প্রাচীন
পরাহত আকাঙ্ক্ষায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায়
আর বহমান নদীগুলো ঢেউ তোলে-

রক্তের স্পন্দনে। হাজার কাহিনি তার
বিচিত্র কথার জাল জন্ম-জন্মান্তরে
অজস্র উত্থান হয়ে অবিরত জ্বলে।

বুক জুড়ে মরমিয়া স্বপ্নের আঙ্গিনা
অনাদির ছায়া ঢাকা পাখিপ্রীতি বৃক্ষসুখ
মানবিক রোদের বিন্যাসে।

আশা

একদিন বুকের পাজর ভেদ করে জন্ম নেয় ধ্বনি
ভূমিষ্ঠ শিশুর মতন তার গায়ে লেগে থাকে চেতনার রক্ত
একদিন সে যন্ত্রণার তুমুল মশাল হয়ে জ্বলে উঠে
সেই আলোর ঝর্ণাধারাটির নাম হয় আশা
তার বিগলিত স্রোত অবারিত স্বপ্নের প্রান্তর পেরিয়ে
নেমে আসে অকর্ষিত ভাষার উপত্যকায়
যার রেখাচিহ্ন অসংখ্য নদীর মতো দিকে দিকে ছুটে।

সেই রেখাচিহ্নধরে যেতে যেতে দেখি তার কত উত্থান-পতন
মর্মমূলে অব্যক্ত যন্ত্রণা দুঃখ ক্ষোভ ক্ষুধার পীড়ন
প্রেম কাম অভিমান। হয়তো সুশোভিত বদ্বীপে আবার ভাঙ্গন।
নির্ভরতার উপত্যকায় ভূমি ধ্বস। ভেসে যাওয়া বাসনার হাহাকার।
এভাবেই অকথিত শূন্যতায় বহুদূর সময় গড়ায়।

হয়তো আবার কোথাও জেগে ওঠে বিশ্বাসের চর।
নতুন স্বপ্নের বুক ভেদ করে ওঠে আসে ফসলের চীৎকার।
অদম্য বল্লমে বিদ্ধ খুলে যায় বাধার প্রাচীর।
রমণীয় কোন স্বপ্নে বেড়ে ওঠে চারাগাছ, শস্যবীজ, সাহসী পৌরুষ।
বুক জুড়ে গৃহপালিত প্রেমের উত্তাপ। আপত্য সংসার।
স্নিগ্ধ সকালের মতো হেসে ওঠে জোয়ের মওসুম।
ভরা ঐশ্বর্যের মাঠ আর দিনগুলো পাখিময়।

হয়তো আবার আসে চরভাঙা দুঃস্বপ্ন আর
অজানা ব্যধির মতো ছিড়ে খায় সমস্ত অর্জন!

পিপিইপরা শুক্লপক্ষের চাঁদ

মধ্যরাতে দেখি সাদা পিপিই পরা শুক্লপক্ষের চাঁদ
থেমে যাওয়া অ্যাম্বুল্যান্সের মতন আচ্ছন্ন জোছনা
আর কী অদ্ভুত মাস্কপরা এই রাতের নীরবতা
লকডাউন শহরে ঘুরে উদ্বেগের সাদা ঘোড়া!

অচঞ্চল বাল্বের মতন ডাক্তার ও নার্সেরা
আটান্নটি আইসোলেশন বেডে সুদূরের নির্জনতা
ঝুলে আছে ভেন্টিলেটরের ফ্রেমে
সমাগত মৃত্যুর হাত ধরে!

আজ শহরের বুক ভরে আছে করোনা ক্লান্তি
মর্গের মতন শোক, পিপিইপরা পূর্ণিমার চাঁদ
আলোর প্রতিবিম্বে থোকা থোকা কোয়ারান্টাইন
শহরে ছড়িয়ে দেয় শোকাহত কবরের আইন!!
০৪.০৫.২০

পরিযায়ী শব্দের বিভ্রম

রাত ও দিনের রূপ একাকার নৈশব্দের মাঝে
মানুষের বুকে সঘন হয়ে ওঠে কোয়ারান্টাইন
তখন হয়তো জোছনার নীরবতা গিলে খায় অদৃশ্য ভাইরাস

আদিম ভয়েরা যেনো ডানা ঝাপটায় স্বপ্নের বারান্দায়
দিশাহীন দারিদ্র্য মুখ থুবড়ে পড়ে গলির ভাগাড়ে
বুক থেকে হামাগুড়ি দিয়ে নামে দূরের আশঙ্কা

সারারাত পঙ্গপালের মতন ঝরে শব্দের বিভ্রম
দিনকে রাতের ফ্রেমে বন্দী করে অলৌকিক আইন
সাদা পিপিইর ভেতরে ঢেকে রাখে সময়ের চঞ্চলতা

কেমন একাকার হয়ে যায় থাকা ও না থাকা
একাকিত্বের তীরে বিদ্ধ নিসর্গ ও নির্জনতা
সহসাই মনে হয় চারপাশে পৃথিবীর সব রঙ সাদা

গার্মেন্টসের নারী শ্রমিকেরা অদ্ভুত ফ্যাকাশে ও সাদা
সময়কে বুকপকেটে রেখে সব যান্ত্রিকতা এখন সাদা
আমরা যাকে জীবন বলি সেও কেমন নিঃস্তব্ধ ও সাদা!!
০৫.০৫.২০

স্বীকৃতি

পথের ক্লান্তির অবসরে জুতার সুকতলি পর্যন্ত ছিড়ে যায় তার
পায়ে পড়ে উনুনের মতো দগদগে ব্যর্থতার ফোস্কা
সে শুধু চেয়েছিল তার স্বোপার্জিত কবিতার কিছুটা স্বীকৃতি
যা সে অর্জন করেছিল বিপন্ন মানুষের অন্তিম আকাঙ্ক্ষা থেকে
যা বুক চেরা রক্তের মতন উষ্ণ ও আকুলতায় বাঁক ফেরানো
সাত শত নিহত নদীর হাহাকার যার প্রতিটি ধ্বনি সম্ভারে
অথচ নতুন এক সম্ভাবনার চরে জেগে ওঠা শস্যের সুগন্ধে স্নাত।

কিন্তু তার স্বীকৃতি তো তিরিশ বছরে কোথাও মেলেনি!
পন্ডিতেরা তা শোনার আগেই কেমন গিধরের মতো গোদ গোদ করে
আর উত্তরাধুনিক কবিতা ক্যাফেতে বাসি কদমের গন্ধ
অথচ বুঝি না এইসব ভাগাড়ে কী ভাবে তারা এতো এতো বগল বাজায়
আহা, শিখবার বহু আগেই তারা অভিজ্ঞ শিক্ষক হয়ে যায়!
গোপনে গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে অযোগ্যেরা রাতারাতি স্বীকৃতি বাগায়
আর অন্বেষী কবির কৃতী কর্পোরেট স্রোতে ভেসে যায়!

তবু কবি হারানো স্বপ্নের খোঁজে এ শহরে জনপদে তন্ন তন্ন ঘুরে
মানুষের স্বার্থ দ্বন্দ্বে নিহত নদীদের দীর্ঘশ্বাস সযত্নে তুলে আনে
গুম হয়ে যাওয়া সম্ভাবনার সন্ধানে অবিরত পথ হাঁটে
মধ্য দুপুরে অবিচল দাঁড়িয়ে থাকে দুঃসহ রোদের রিমান্ডে!

বিনির্মাণ শিল্পের সপক্ষে
(মুশতাক খন্দকার ও ক্বণন শিল্পীদের)

কখনো এমন হয় চারপাশে শুদ্ধতম কোন ঢেউ নেই
নগরে আছড়ে পড়ে ব্যধিগ্রস্ত দীর্ঘশ্বাস
বাতাসে সিসার গন্ধ ঘুরে ফিরে অজানা উদ্বেগ
কর্পোরেট নগরীতে দিনের ভিতরে রাত হানা দেয়
একটা গোলক ধাঁধা দবদবে সাদাকেও করে দেয় ম্লান
কেমন নিস্প্রভ হয়ে যায় সব গৌরবের কৃতিত্ব সম্ভার।

সবকিছু ঢেকে দিয়ে নামে যেন এক বালিয়ারি
উড়ায় শঙ্কার ধূলো, দীর্ঘ হয় নিঃসঙ্গতার ছায়া
ভূত আর ভবিষ্যত একাকার শুধু নেই বর্তমান!
এমন দুঃসহ দিনে মশালের মতো জ্বলে মানবিক মন
বুক থেকে সহসাই নেমে আসে ক্ষোভ
লোকে যাকে দ্রোহ বলে, বিনির্মাণ শিল্পের সপক্ষে
কবিতা কবিতা বলে আছড়ে পড়ে চেতনার উপকূলে!

লেখক, কবি ও লোকসাহিত্য গবেষক।

শেয়ার করুন
  • 226
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    226
    Shares

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে