করোনা : অবাধে বিক্রি হচ্ছে মানহীন সুরক্ষাসামগ্রী, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

মত ও পথ প্রতিবেদক

করোনার মহামারীতে ভেজাল, নকল নিম্নমানের সুরক্ষাসামগ্রীতে বাজার ছেয়ে গেছে। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী বাজারে মানহীন পণ্য সরবরাহ করছে। এসবের অধিকাংশ চোরাইপথে বিদেশ থেকে আসছে। কিছু তৈরি হচ্ছে দেশেই।

এগুলো আমদানি ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত কিছু মৌসুমি ব্যবসায়ী। খুচরা পর্যায়ে ফুটপাত, পাড়া-মহল্লার মোড়সহ বিভিন্ন স্থানে এসব সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে। এগুলো ব্যবহারে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি ব্যাপক হারে বাড়ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা প্রাণঘাতী করোনারভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী (পিপিই, মাস্ক, স্যানিটাইজার, ফেসশিল্ড, হ্যান্ড গ্লাভস) ইত্যাদি ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এসব পণ্য ব্যবহারের তাগিদ দিয়েছে বারবার। ফলে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তায় সবাই সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করছেন।

এ সুযোগকে কাজে লাগাতে মাঠে নেমেছে কিছু মৌসুমি অসাধু ব্যবসায়ী। এসব নকল ও মানহীন সুরক্ষাসামগ্রীর বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা আরও বৃদ্ধি এবং এসব পণ্য আমদানি ও বিক্রি বন্ধে সংশ্লিষ্টদের তৎপর হওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

নকল পণ্যের ক্ষতি সম্পর্কে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান মত ও পথকে বলেন, স্বাস্থ্য সম্পৃক্ত পণ্য নকল হলে দু’ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি হয়- প্রথমত, মাস্ক বা স্যানিটাইজার যদি নকল হয় তাহলে যে কাজে সেটি ব্যবহার করা হচ্ছে তা ফলপ্রসূ হবে না। অর্থাৎ এসব পণ্য ব্যবহার করে জীবাণুর সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব নয়।

অন্যদিকে, যারা না জেনেই নকল পণ্য ব্যবহার করবেন তারা অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করবেন না। কারণ তারা জানেন যে, তদের সুরক্ষা রয়েছে। কিন্তু তাদের ব্যবহৃত পণ্য সুরক্ষা দিতে পারবে না। ফলে যারা না জেনেই নকল পণ্য ব্যবহার করছেন তারা সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছেন।

তিনি বলেন, দেশের মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে এসব পণ্য আমদানি, বিক্রি ও বিপণনের ক্ষেত্রে সরকারের আরও কঠোর হওয়া দরকার।

নকল মাস্ক ও সুরক্ষাসামগ্রী বিক্রির অপরাধে ২২ জুন ঢাকার মোস্তফা কামাল নামের এক খুচরা ব্যবসায়ীকে এক বছর কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এর আগে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত নিউমার্কেটের ৪টি দোকানকে আড়াই লাখ টাকা জরিমানা করেন। রাজধানীর পান্থপথে এএসএম ট্রেডিং নামের একটি প্রতিষ্ঠানে বিপুল পরিমাণ নকল গ্লাভস ও গাউন জব্দ করে র‌্যাব। এ সময় ১০ লাখ টাকা জরিমানা ও গোডাউন সিলগালা করা হয়। এরপরও এগুলো বন্ধ হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনার মতো প্রাণঘাতী ভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে মাস্ক এবং স্যানিটাইজার পিপিইর ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নকল মাস্ক এবং স্যানিটাইজার ব্যবহার করলে কোনো লাভই হবে না। উল্টো স্বাস্থ্য ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়ে যাবে। এরপরও এ ধরনের পণ্য বাজারজাত করছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। বিভিন্ন কোম্পানির নাম ব্যবহার করে নকল মাস্ক ও স্যানিটাইজার বিভিন্ন স্থানে বিক্রি হচ্ছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নগরীর প্রায় প্রতিটি সড়কের মোড়েই স্যানিটাইজার, মাস্ক, ফেসশিল্ডসহ নানা ধরনের সুরক্ষাসামগ্রী বিক্রি হচ্ছে। তাৎক্ষণিকভাবে দেখে এসব পণ্য আসল না নকল তা বোঝা প্রায় অসম্ভব। কারণ এসব পণ্যে প্রতিষ্ঠানের নাম, ব্যবহৃত উপাদান সবই উল্লেখ রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর মাছ ব্যবসায়ী মো. ইসমাইল হোসেন বর্তমানে মাস্কের ব্যবসায় নেমেছেন। করোনায় লকডাউনে তার ব্যবসা খারাপ যাওয়ায় তিনি মাস্কের ব্যবসা শুরু করেছেন। একটি অভিজাত শপিংমলের মোবাইল ফোন ব্যবসায়ী শাকিলও নেমেছেন মাস্কের ব্যবসায়। দোকান বন্ধ থাকায় তিনি চীন থেকে নকল এন-৯৫ মাস্ক এনে বিক্রি করছেন।

জানা গেছে, ইসমাইল পুরান ঢাকা থেকে নকল এন-৯৫ মাস্ক পাইকারি কিনলেও শাকিল চীন থেকেই পণ্য আনেন। অথচ তাদের কারোরই এসব পণ্য সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। এমনকি এ ব্যবসা করার জন্য অনুমোদন নেই সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের।

বিস্তারিত পরিচয় প্রকাশ না করে শাকিল বলেন, আসল-নকল আমি চিনি না। হ্যান্ডসেট বিক্রি বন্ধ, তাই কিছু করে সংসার চালাচ্ছি। ইসমাইল, শাকিলদের মতো ব্যবসায়ীরা নকল (কপি) কেএন-৯৫, এন-৯৫ মাস্ক বিক্রি করায় চরম হুমকির মুখে পড়ছে জন-জীবন।

সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাংলামোটরের জহুরা টাওয়ারের বিভিন্ন দোকানে অভিযান চালায়। সেখানে অ্যাডভান্স বায়ো কেমিক্যাল (এবিসি) নামে একটি প্রতিষ্ঠান এন-৯৫ বলে নকল মাস্ক কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি করছিল।

এছাড়া সেখানে এন-৯৫ ছাপ দেয়া অনেক মাস্কের খালি প্যাকেটও পাওয়া যায়। নকল মাস্কগুলো এসব ব্যাগে ভরে বিক্রি করত। কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে চীন থেকে নিম্নমানের মাস্ক এনে এন-৯৫ বলে বিক্রি করে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানিয়েছে। প্রত্যেকটি পণ্য ১০-১৫ গুণ দামে তারা বিক্রি করত। তবে পণ্য আমদানির কোনো বৈধ কাগজপত্র তারা দেখাতে পারেনি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কোনো মেডিকেল পণ্য আমদানি করতে হলে প্রথমেই উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সিই সার্টিফিকেট, এফডিএ সার্টিফিকেট, আইএসও সনদ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত কিনা এসব যাচাই করা আবশ্যক। তাছাড়া রফতানিকারক এবং আমদানিকারক উভয়েরই ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের নিবন্ধিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু অনুমোদন সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্রই এদের নেই।

শাকিল ও ইসমাইলের মতো অনেকরই নেই আমদানির সার্টিফিকেট। এমনকি তারা জানেন না কিভাবে এলসি দিতে হয় কিংবা এ সুরক্ষাসামগ্রী আমদানি করতে সরকারের কোন দফতরের অনুমোদন নিতে হয়। তারা বাংলাদেশ থেকে অবৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠিয়ে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কম দামের পণ্য কিনে এয়ারপোর্টের অসাধু সিএন্ডএফ ব্যবসায়ীদের ওয়্যার হাউসে দিয়ে দেন। এক সপ্তাহ থেকে ১০ দিন পর সেখান থেকে ঢাকায় নিজেদের গোডাউনে রেখে অধিক দামে বিক্রি করছেন।

এ প্রসঙ্গে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের পরিচালক আইয়ুব হোসেন মত ও পথকে বলেন, সব ধরনের মেডিকেল পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ঔষধ প্রশাসনের নীতিমালা মানা আবশ্যক। সরকারের সংশ্লিষ্ট সব দফতরেই এসব নির্দেশনা দেয়া আছে। তারপরেও কারা কিভাবে নকল ও মানহানী পণ্য আমদানি করছে সেটি আমাদের পক্ষে বলা সম্ভব নয়। তবে বিভিন্ন সময় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আমরা অভিযান পরিচালনা করছি।

শেয়ার করুন
  • 12
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    12
    Shares

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে