সংশোধনাগার, না সন্ত্রাসাগার? ।। আহমদ রফিক

আহমদ রফিক
আহমদ রফিক। ফাইল ছবি

বাংলাদেশে বহু অঘটনের মধ্যে একটি বিপজ্জনক দিক ‘কিশোর গ্যাং’-এর বেপরোয়া সন্ত্রাসীপনা। ঘটনা বিপজ্জনকই শুধু নয়, সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিচারে অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ কথাটা বহুল প্রচলিত ‘শিশু-কিশোররাই জাতির ভবিষ্যৎ’। সেই জাতীয় ভবিষ্যতের একাংশ যদি পথভ্রষ্ট হয়ে সন্ত্রাসের রকমারি পথ ধরে, তো বিপদের গভীরতা ও তাৎপর্য অনুমান করতে বিশ্লেষকের বিচার-ব্যাখার প্রয়োজন পড়ে না, সেই গুরুত্ব এমনিতেই বোঝা যায়।

এ ক্ষেত্রে সামাজিক শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তারক্ষক বাহিনী এবং প্রশাসনের দায়িত্বের কথা উল্লেখের প্রয়োজন পড়ে না। বরং দুর্ভাগ্যজনকই বলতে হয়, এমন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে উদাসীনতা বা যথাযথ তৎপরতার বিষয়টি। গত সংখ্যায় এ বিষয়ের লেখাটিতে আমরা উল্লেখ করেছি র‌্যাবের প্রতিবেদনের দু-একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। তাতে দেখা যায়, এখনো ৪২টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়।

বলার অপেক্ষা রাখে না, এই ৪২ যে ভবিষ্যতে কত বিয়াল্লিশে পরিণত হবে তা হিসাব করা খুবই কঠিন হবে। এ কারণে এবং উল্লিখিত একাধিক কারণে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও মাঠপর্যায়ের তৎপরতা যথাযথ গুরুত্বে সচল রাখা দরকার, যাতে শেষ সন্ত্রাসীটিকে সংশোধনাগারে না পাঠানো পর্যন্ত তৎপরতা বন্ধ না হয়।

আমার ভাবতে অবাক লাগে যে এমন গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়টিকে পুরোপুরি নিষ্পত্তি না করে কেন ফেলে রাখা হয়েছে। লক্ষ করার বিষয় যে যত দিন যাচ্ছে, নতুন নতুন গ্রুপ তৈরি হচ্ছে, ঘটছে নতুন নতুন অপরাধমূলক ঘটনা, বিশেষ করে খুন ও মাদকবিষয়ক ঘটনা। এ সম্পর্কে ছোট্ট একটি খবর, ‘ফতুল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের ডাকাতি, গ্রেপ্তার ২’। অর্থাৎ অপরাধের পরিধি বাড়ছে বিভিন্ন চরিত্রে। ভাবা যায়, কিশোররা ডাকাতির মতো অপকর্মেও লিপ্ত হচ্ছে?

আমরা এর আগে প্রতিরোধক ব্যবস্থা হিসেবে লিখেছিলাম পরিবার থেকে শিক্ষায়তন পর্যন্ত দায়দায়িত্বের কথা। সেখানে প্রসঙ্গক্রমে শ্রেণিকক্ষ থেকে খেলার মাঠ পর্যন্ত কিশোর শিক্ষার্থীদের ওপর শিক্ষকদের নজরদারির কথা লিখেছিলাম। আশ্চর্য, কয়েক দিন পরই এর বাস্তবতা প্রমাণিত হলো।

সম্প্রতি একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত খবর : ‘খেলার মাঠ থেকে কিশোর গ্যাংয়ে’। আমরা ঘটনার বিবরণে যাচ্ছি না। শুধু এটুকুই বলতে চাই, এই কিশোর গ্যাং সৃষ্টি শ্রেণি-নির্বিশেষ। দরিদ্র দিনমজুর বা রিকশাচালকের সন্তান থেকে মধ্যবিত্ত এবং অভিজাত পরিবারের সন্তান পর্যন্ত নানা কারণে সন্ত্রাসী গ্যাংয়ে যুক্ত হয়ে পড়ে। বর্তমান সংবাদটিতে আমরা দেখি এক দরিদ্র রিকশাচালকের সন্তানকে কুসঙ্গের তাড়নায় সন্ত্রাসীপনায় হাতে খড়ি নিতে। নেপথ্য কারণ দারিদ্র্য।

দুই.

আমাদের আজকের আলোচ্য বিষয় অবশ্য একটু ভিন্ন—কিশোর গ্যাংয়ের আনুষঙ্গিক ঘটনা, যা মৃত্যুর বর্বরতা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে কর্মকর্তাদের ম্যাডিস্ট মানসিকতার কারণে। একটু আগে আমরা সংশোধনাগারের কথা বলছিলাম। সাধারণ কিশোর অপরাধীদের কারাগারে ভয়ংকর সন্ত্রাসী বা পাকা ক্রিমিনালদের সাহচর্যে রাখা হয় না, সংগত যুক্তিতে তাতে তারা আরো পাকাপোক্ত ক্রিমিনাল বা সন্ত্রাসী হয়ে বেরিয়ে আসবে। তাই তাদের জন্য নির্ধারিত সংশোধনাগার।

সেখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে, সুস্থ পরিবেশে, সদুপদেশে তারা অপরাধজগতের অন্ধকার থেকে সুস্থ ও সামাজিক পরিবেশে ফিরে আসতে পারে। তাই সংশোধনাগারের নাম দেওয়া হয়েছে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র, শিশুর বয়স সংজ্ঞানুযায়ী বলা চলে শিশু-কিশোর বা কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র। আমি বরং এগুলোর গায়ে সুশ্রী লেবেল না এঁটে এগুলোকে সংশোধনাগারই বলতে চাই। তাতে উদ্দেশ্যটা স্পষ্ট হবে। করণীয়টি চোখের সামনে থাকবে, থাকবে পরিচালক-কর্মকর্তাদের মাথায়।

সম্প্রতি যশোরে কথিত শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে (সংশোধনাগার) সংঘটিত ভয়াবহ ঘটনা অর্থাৎ তিন কিশোরকে পিটিয়ে মারার নিষ্ঠুর, নৃশংস ঘটনা সারা দেশে শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী মহলে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। আগেই বলেছি, কথিত উন্নয়ন কেন্দ্রে শিশু-কিশোর অপরাধীদের পাঠানো হয় তাদের সংশোধন তথা চরিত্র বদলের জন্য, সুস্থ মানসিকতা গড়ে তোলার জন্য।

আধুনিক অপরাধবিজ্ঞান বলে, একজন শিশু-কিশোর অপরাধীকে সৎপথে আসতে তার মানসিক পরিবর্তন ঘটানোর উপায় কঠোর সাজা, নির্মম ব্যবহার নয়, তাতে সে মনের দিক থেকে আরো অপরাধপ্রবণতার দিকে ঝুঁকে পড়বে। সে ক্ষেত্রে দরকার স্নেহ-মায়া-মমতা এবং নমনীয় ব্যবহার। কঠোর ভাষায় নয়, বরং শিক্ষণীয় ধারায় সুস্থ জীবনের আকর্ষণীয় দিকগুলো সম্পর্কে বুঝিয়ে বলা, সেদিকে তার মানসিক ঝোঁক বৃদ্ধি করা।

কঠোর ব্যবহারে শিশু বা কিশোর মনে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় মনোবিজ্ঞানীরা সেদিকে লক্ষ করেই অপরাধবিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যার সঙ্গে সুর মিলিয়ে প্রায় একই ধরনের মতামত ব্যক্ত করেছেন। এবার আমাদের প্রশ্ন : উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোর নীতিমালায় কি তেমন আদর্শ পরিচর্যার কথা বলা হয়েছে? বা বলা হয়ে থাকলেও কি উন্নয়ন কেন্দ্রের পরিচালনায় নিয়োজিত কর্মকর্তারা সেই পথ ধরে চলেন!

যশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের ঘটনা তা বলে না। সেখানে এবং অন্য উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোতেও অব্যবস্থাপনাই ব্যবস্থা। যশোর কেন্দ্রে দেখা যাচ্ছে কেন্দ্রটিতে যেসংখ্যক শিশু-কিশোর রাখার ব্যবস্থা রয়েছে, সেই নির্দিষ্ট সংখ্যার দ্বিগুণ শিশু-কিশোর সেখানে রাখা হচ্ছে। ফলে অপরিণত বুদ্ধি শিশু-কিশোরদের মধ্যে কখনো কখনো তাদের নির্দিষ্ট শোবার স্থান নিয়ে হাতাহাতি বা মারামারি পর্যন্ত ঘটে যায়। শুরু হয় কথা-কাটাকাটি থেকে। এটা শিশু বা কিশোর আচরণের পক্ষে অস্বাভাবিক কিছু নয়।

এ ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের দায়িত্ব শান্ত ব্যবহারে সমস্যা মেটানোর ব্যবস্থা করা। কঠোর ব্যবহার বা শাস্তি সমস্যার সমাধান নয়। অথচ তাদের আচরণে এর বিপরীতটাই ঘটতে দেখা গেছে। এর নিষ্ঠুরতম উদাহরণ যশোর কেন্দ্রে—তিন কিশোর হত্যা।

সংগত কারণে দৈনিক পত্রিকায় সংবাদ শিরোনাম : শিশুদের নিরাপদ আশ্রয়ে ‘রক্ষকই ভক্ষক’/‘সংশোধনের বদলে অপরাধী হয়ে ওঠার শঙ্কা বিশেষজ্ঞদের’। এখানেই শেষ নয়। ওই ঘটনার দায় যে অংশত কর্মকর্তাদের ওপর কেউ কেউ চাপিয়েছেন তার আনুষঙ্গিক প্রমাণ এই প্রতিবেদনেও রয়েছে : ‘অনুগত দল তৈরি করেন কর্মকর্তারা/অন্যদের ওপর নামে নির্যাতনের খড়্গ’/‘পড়াশোনা লাটে উঠেছে’। (১৭.৮.২০২০, কালের কণ্ঠ)।

বিশ্বাস করা কঠিন যে ‘তিন কিশোর হত্যায় কর্মকর্তারা জড়িত ছিল’। কথাটা আমাদের নয়, তদন্ত কমিটির প্রধানের বক্তব্য। সে জন্যই পূর্বোক্ত সংবাদ শিরোনামে ‘রক্ষককে ভক্ষক’ বলা হয়েছে। এই নৃশংস ঘটনা উপলক্ষে একাধিক সংবাদপত্রের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে যে সমস্যা শুধু বিছানার সংখ্যাল্পতাই নয়, সরকার কর্তৃক বরাদ্দ অর্থের পরিমাণমাফিক খাদ্য সরবরাহ করা হয় না কেন্দ্রের শিশু বা কিশোরদের।

অর্থাৎ বাংলাদেশি সমাজের অভিশাপ দুর্নীতিরও এখানে অনুপ্রবেশ। শিশুরা অসুস্থ হলে চিকিৎসার যথাযথ ব্যবস্থা হয় না—এমন বহু অভিযোগ উঠে এসেছে কেন্দ্র পরিচালনায় নিয়োজিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। শেষ পর্যন্ত রক্ষক তথা অভিভাবক কর্মকর্তাদের হাতে মৃত্যু ঘটল তিন হতভাগ্য কিশোরের।

এই নিষ্ঠুর ঘটনার যাতে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় সে জন্য ‘তিন কিশোর হত্যায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি’ করা হয়েছে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে। আমরা তা সংগত মনে করি। সরকারি অর্থের অপচয়, দুর্নীতি, অদক্ষতা ও সর্বশেষ হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচার ও শাস্তি না হলে এজাতীয় ঘটনা ঘটতেই থাকবে।

আমাদের শেষ কথা, সংশোধনাগার একটি স্পর্শকাতর ব্যবস্থা। এ দেশে কি সৎ, দক্ষ কর্মকর্তার এতই অভাব ঘটেছে যে অন্তত শিশু-কিশোরদের সংশোধন করার মতো মানবিক চেতনাসম্পন্ন দরদি, সৎ, দক্ষ এবং অভিভাবকসুলভ মানসিকতার কর্মকর্তা মিলবে না। আমাদের দাবি, সরকার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনায় নেবে এবং সংশোধনাগারের পরিচালনা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাবে।

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

শেয়ার করুন

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে