ধর্ষণ প্রতিরোধে চাই সামাজিক আন্দোলন

সম্পাদকীয়

রাষ্ট্রের কঠোর আইন, নারী অধিকার সংগঠন, মানবাধিকার সংগঠন ও নাগরিক সমাজের প্রতিবাদ- এককথায় বলতে গেলে কোনো কিছুতেই কমছে না ধর্ষণকারীদের দৌরাত্ম্য। দেশের আনাচে-কানাচে প্রতিনিয়ত ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন ৫ বছরের শিশু থেকে শুরু করে সত্তোরোর্ধ্ব বৃদ্ধাও। কয়েক সপ্তাহ ধরে সংক্রামক ব্যাধির মতো বেড়ে গেছে ধর্ষণপ্রবণতা। আর এসবে প্রতিবাদে রাজধানীসহ সারা দেশজুড়ে চলছে ধর্ষণ বিরোধী বিক্ষোভ।

সিলেটের এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণযজ্ঞের পর নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন চালানো এবং সেই ন্যক্কারজনক পৈশাচিকতার ভিডিও চিত্র ধারণ করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় প্রতিবাদ-বিক্ষোভে ফেটে পড়ে দেশের সর্বস্তরের মানুষ এবং দাবি উঠে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড রেখে আইন পাশের। জনগণের এই দাবির প্রেক্ষাপটে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে সংশোধিত ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০’ এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে এটি ১৩ অক্টোবর থেকে কার্যকর করা হবে। আমরা সরকারের এই তড়িৎ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই।

দেশজুড়ে ধর্ষণপ্রবণতা বৃদ্ধির অন্যতম নিয়ামক হলো আইনের শাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব। এক্ষেত্রে যারা মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন তারা অনেকেই রাজনৈতিক নেতাদের দিকে তাকিয়ে থাকেন। যার ফলে অনেক সময় ধর্ষণ মামলার তদন্তগুলো সঠিকভাবে ও তড়িৎগতিতে সম্পন্ন হয় না। আর এসবের কারণেই দিন দিন ধর্ষণের প্রকোপ দেশজুড়ে বেড়েই চলেছে। এটি শুধু বাংলাদেশে নয়, সারাবিশ্বেই ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের সংখ্যা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। তবে এ কথ সত্য যে ধর্ষণ ও নারীর প্রতি সহিংস নানা অপরাধের বিচার ঠিকমতো হলে, অপরাধীদের দণ্ড হলে এবং তারা সেই দণ্ড ভোগ করলে আজ বাংলাদেশে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের চিত্র এমন ন্যক্কারজনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারত না। সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২০ সালের জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার মাত্র ৩ দশমিক ৫৬ শতাংশের ক্ষেত্রে আদালতের রায় ঘোষিত হয়েছে; আর অপরাধীদের দণ্ডাদেশ ঘোষিত হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৩৭ শতাংশ মামলায়। অর্থাৎ ৯৯ শতাংশের বেশি মামলায় শাস্তির বাইরে থেকে গেছে অভিযুক্ত আসামিরা।

আমরা লক্ষ্য করছি ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধকে একটি মহল রাজনীতির দাবার গুটি হিসেবে ব্যবহার করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। তাদের বক্তব্য শুনে  মনে হয় ধর্ষণের সাথে শুধু ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরাই জড়িত। আমরা মনে করি, ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ নিয়ে রাজনীতি করা-ও এক ধরনের অপরাধ।  কেননা ধর্ষণের সাথে শুধু ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরাই জড়িত নয়, এসব অপরাধের সঙ্গে বিরোধী দলের নেতাকর্মী, স্কুল শিক্ষক, ছাত্র, যুবক, কৃষক, মসজিদের ইমাম, মাদ্রাসার শিক্ষক, মন্দিরের পুরোহিত, গির্জার ফাদারসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ জড়িত।  সুতরাং ধর্ষণের মতো সামাজিক এই ব্যাধি প্রতিরোধের একমাত্র উপায় হলো আইনকে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে কাজে লাগানো এবং তড়িৎগতিতে যাতে আইনের প্রয়োগ হয় তা নিশ্চিত করা। এমতাবস্থায়  এই ধরনের অপরাধের যেন দ্রুত বিচার হয় সেজন্য ধর্ষণ ও নারীর উপর নিপীড়ন সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দ্রুত কার্যকর করার জোর দাবি জানাচ্ছি।

অনেক সময় আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অপরাধীরা শাস্তি থেকে পার পেয়ে যায়; এসব মামলার ক্ষেত্রে নতুন আইন কীভাবে দ্রুত কার্যকর করা যায় এবং আদালতের রায়ও কীভাবে দ্রুত কার্যকর করা যায় এই বিষয়টি ভাবনায় রেখে প্রয়োজনে আইনটি আরও সংশোধনের জন্য আমরা অনুরোধ করব। পাশাপাশি আইন শৃঙ্খলার দায়িত্বে যারা নিয়োজিত আছেন তারা যেন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে কাজ করতে পারেন তার নিশ্চয়তা দেওয়ার জন্য সরকারের যারা উচ্চ পর্যায়ে আছেন (মন্ত্রী, সচিব,আইজিপি) তাদেরকে অনুরোধ করব। সেইসঙ্গে এক্ষেত্রে যাতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাবে কোনো অপরাধীই ছাড় না পায় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকার জন্য রাষ্ট্রের সর্বস্তরের মানুষকেও আহ্বান জানাচ্ছি। মনে রাখতে হবে, ধর্ষণ একটি সামাজিক ব্যধি। এটিকে প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই।

শেয়ার করুন
  • 511
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    511
    Shares

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে