শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দিন

সম্পাদকীয়

বৈশ্বিক মহামারি করোনার কারণে গত ১৮ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। দীর্ঘ প্রায় ৮ মাস হতে চললেও এখনো বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা স্কুল-কলেজ খোলার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য আসেনি। দীর্ঘ বন্ধে প্রাণহীন হয়ে রয়েছে জ্ঞান সৃষ্টি ও বিতরণের বিদ্যাপীঠগুলো। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চশিক্ষা থমকে যাওয়ায় সেশনজটসহ নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। এমতাবস্থায় তারা বিভিন্ন কোর্সের পরীক্ষা নিয়ে ব্যাপক দুশ্চিন্তায় রয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন যাবৎ বন্ধ থাকায় এর বিরুপ প্রভাব পড়েছে গ্রামীণ জীবনে।  কেননা মফস্বল এলাকাগুলোতে নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে ভার্চুয়াল ক্লাস নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলশ্রুতিতে শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া থেকে দূরে সরে যাচ্ছে; আবার যেসব অভিভাবকদের সামান্য অর্থকড়ি আছে তারা নিজেদের সন্তানদের প্রাইভেট পড়ানোর দিকে ঝুঁকছেন। করোনাজনিত বন্ধের কারণে দেশের পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন কোর্সের শুধু পরীক্ষাই স্থগিত রয়েছে লক্ষাধিক ছাত্র-ছাত্রীর; অনেক শিক্ষার্থীর স্নাতক শেষ বর্ষ এবং স্নাতকোত্তর শেষ সেমিস্টারের কিছু পরীক্ষা বাকি থাকায় অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হলো তাদের। কারণ করোনা মহামারি না থাকলে তারা এত দিন সনদ পেয়ে যেত। কারো কারো চাকরি হওয়ারও সম্ভাবনা ছিল। আমরা মনে করি, দীর্ঘদিন ক্যাম্পাস বন্ধের কারণে স্থগিত পরীক্ষাগুলো দ্রুত সমযের মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত। কেননা এখনই যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা  নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ না করা হয় তাহলে তাদেরকে অন্তত এক থেকে দুই বছরের সেশনজটে পড়তে হবে।

বর্তমানে খোলা রয়েছে দেশের সব সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, হাটবাজার, সিনেমা হল সবকিছুই প্রায় স্বাভাবিক। এছাড়া করোনা মহামারিতে ক্লাসে জনসমাগম এড়াতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিটি কক্ষে তালা ঝুললেও বন্ধের এ অলস সময় পার করতে ঐসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে ফুটবল-ক্রিকেটসহ বিভিন্ন টুর্নামেন্ট! ট্যুরিস্ট স্পষ্টগুলোতেও ভ্রমণপিপাসুদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষণীয়। সরকারের অনুমোদন নিয়ে দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোও খোলা আছে। ইউনিসেফের তথ্যমতে কোভিড আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে গত আগস্টে খুলে দেওয়া হয়েছে ৫৯টি দেশের শিক্ষপ্রতিষ্ঠান। করোনাভাইরাস সংক্রমণের মধ্যেই প্রতিবেশী দেশ ভারত স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। মূলত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত। এমনকী করোনার উৎপত্তিস্থল চীনের উহানে এখন সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চালু করেছে ওই দেশের সরকার।

এ কথা সত্য যে, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যারা অধ্যয়ন করছে, তারা নিজেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যপারে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন। তাছাড়া যেহেতু করোনা মহামারি কবে নাগাদ বিশ্ব থেকে নির্মূল হবে তা বলা কঠিন সেহেতু করোনার সংক্রমণ শেষ হওয়ার দিকে না তাকিয়ে এর সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার কৌশল আমাদের শিখতে হবে। আমরা মনে করি, ভ্যাকসিন পাওয়ার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রাখা কখনই যুক্তিযুক্ত নয়। এতে করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা আরও বাড়বে। তাই সরকারের কাছে আমাদের আবেদন থাকবে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি পুষিয়ে নেওযার লক্ষ্যে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে পর্যায়ক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়, উচ্চমাধ্যমিক, মাধ্যমিক এবং প্রাথমিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়া হোক এবং পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সেশন ও সেমিস্টারে স্থগিত পরীক্ষাগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যে নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক। এক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা যেহেতু অধিক, কাজেই প্রয়োজনে পর্যায়ক্রমে শ্রেণিগুলোকে শিফট করে ক্লাস নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

শেয়ার করুন
  • 2.7K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2.7K
    Shares

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে